মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে মাধ্যমিকের পাঠ্য করতে মত দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এর স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী। বিশ্ববিদ্যালয়েও ‘লিবারেশন ওয়ার’ নামে একটি কোর্স চালুর প্রস্তাব তার। সাদের মতে, ‘সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের মধ্যে যে উগ্রবাদ, উগ্র চিন্তা থেকে কীভাবে মানুষকে বের করে নিয়ে আসা একবিংশ শতাব্দীর একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই জায়গাগুলোতে আমরা কাজ করতে চাই। বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে বাইরে রাখার সুযোগ নেই।’ সাদ আরো বলেন, ‘ছাত্রলীগের রাজনীতির প্রথম শর্ত ছাত্র হতে হবে। এছাড়া যারা বিবাহিত তারা ছাত্রলীগ নয়। এদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স।’
সোমবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে পড়ুয়া ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের এ সাংগঠনিক সম্পাদক এসেছেন দৈনিক ফেনীর সময় কার্যালয়ে। ডাকসু ও ছাত্রলীগ নিয়ে নানা ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ফেনীর এ কৃতি সন্তান। তার বাড়ি পরশুরাম উপজেলার দক্ষিণ গুথুমা গ্রামে আনসার আলী চৌধুরী বাড়ী। এসময় ফেনী সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ও কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি তোফায়েল আহম্মদ তপু ছাড়াও তার সাথে ছিলেন ঢাবি ছাত্রলীগের কর্মসূচী ও পরিকল্পনা সম্পাদক শরীফুল ইসলাম, সহ-সম্পাদক খালেদ হাসান রাহাত, ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ইকবাল মাহমুদ সৈকত ও সাংগঠনিক সম্পাদক লতিফ খান রায়হান প্রমুখ। স্বাক্ষাতকারটি তুলে ধরেছেন প্রধান প্রতিবেদক আরিফ আজম।

ফেনীর সময় : একসাথে দুটি দায়িত্ব, ডাকসু এবং ছাত্রলীগ। কেমন লাগছে ?

সাদ : অন্যরকম একটা ভালোলাগা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সারির শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি, আর অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সংগঠনগুলো নেতৃত্ব দিয়েছে, প্রথম সারির সেই সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন অত্যন্ত গর্বের। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ডাকসু বাংলাদেশকে পথ দেখিয়েছে। সেক্ষেত্রে দুটি অর্জনই আমার জন্য অন্যতম পাওয়া। এখানে থেমে থাকতে চাই না। সবার দোয়ায় আরো এগিয়ে যেতে চাই।

ফেনীর সময় : ডাকসু ও ছাত্রলীগ, কোনটিতে বেশি আত্মতৃপ্তি ?

সাদ : মা এবং বাবা। এক্ষেত্রে ভাগ করার কোন সুযোগ নেই। দুটোই আত্মতৃপ্তির। তবে আত্মতৃপ্তি নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে চলবেনা। কাজ করতে হবে। কাজ করে যেতে চাই। দুটোই আনন্দের, দুটোই আবেগের। দুটোই ভালোলাগার-ভালোবাসার।

ফেনীর সময় : মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ডাকসুর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার প্রথম পতাকাও উত্তোলন হয়েছিল সেখানে, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক হয়ে মুক্তিযুদ্ধ তথা ডাকসু নিয়ে আপনার ভাবনা কী ?

সাদ : ডাকসু নিয়ে আমরা অলরেডি কাজ শুরু করেছি। তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন পাঠ্য-পুস্তক, বিভিন্ন ভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়গুলো প্রচার করা যায়, সাধারণ ছাত্রদের সম্পৃক্ত করে মুক্তিযুদ্ধের প্রোগ্রামগুলো করা যায়, ৭ জন বীর শ্রেষ্ট সহ বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য যেসব বিষয়গুলো রয়েছে তাদের আরো বেশিভাবে জানানোর উদ্যোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের মধ্যে যে উগ্রবাদ, উগ্র চিন্তা থেকে কীভাবে মানুষকে বের করে নিয়ে আসা একবিংশ শতাব্দীর একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই জায়গাগুলোতে আমরা কাজ করতে চাই। বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে বাইরে রাখার সুযোগ নেই। আমরা মায়ানমার, সিরিয়া, লিবিয়া, ফিলিস্তিনের অবস্থা দেখছি। উপযুক্ত নেতৃত্বের কারনে হতভম্ভ অবস্থা। একজন নেতা কী করতে পারে সেটা আমাদের বঙ্গবন্ধু দেখিয়ে দিয়েছেন। সেই জায়গাগুলোতে মানুষকে ইতিহাস জানাতে হবে। দেশ এমনি এমনি স্বাধীন হয়নি। ৩০ লক্ষ মা-বোনের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এসব মানুষকে আরো বেশি করে জানাতে হবে। শুধু পড়ার মধ্যে নয়, মানুষ যেন হৃদয় থেকে এসব উপলব্দি করতে পারে। সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যায় থেকে পাঠ্যপুস্তকে এসব বিষয় চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে কথা বলবো। যেন আরো বেশি সমৃদ্ধ করা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘লিবারেশন ওয়ার’ নামের একটি সাবজেক্ট চালুর জন্য কিছুদিন আগে প্রস্তাব দিয়েছি। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয় চালু হলে গবেষনা থাকবে।

ফেনীর সময় : ছাত্রদের অধিকার আদায়ে ডাকসুর অনেক ঐতিহ্য। সেক্ষেত্রে নিরাপদ সড়ক চাই কিংবা কোটা সংস্কারের মতো আন্দোলনে ডাকসুর ভূমিকা কেমন হবে ?

সাদ : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় সকলের। সবার সমান অংশীদারিত্ব থাকবে। তবে কেউ যেন স্বীয় হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে না চান। ছাত্ররা আন্দোলন করবে, ডাকসু পাশে থাকবে। আপনারা দেখেছেন, গত শনিবার (৮ জুন ২০১৯ইং) বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ হামলা চালিয়েছে। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ডাকসুর জিএস গোলাম রব্বানী কিন্তু ছাত্রদের সাথে একাত্মতা পোষন করেছেন। শুধু এটি নয়, যে কোন যৌক্তিক আন্দোলনে, যৌক্তিক দাবীতে ডাকসু এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থাকবে। ডাকসু ছাত্রদের অধিকার আদায়ে কাজ করে যাচ্ছে।

ফেনীর সময় : ডাকসু এবং ছাত্রলীগে আছেন, সেক্ষেত্রে সাধারণ ছাত্ররা বিষয়টি কীভাবে দেখবে ?

সাদ : মানুষ ব্যক্তিকে মূল্যায়ন করে। কে কী কাজ করছেন, সেটি দেখবে। আমি একটা বড় পদে বসে রইলাম। আমার মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠন উপকৃত হবেনা, তার ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারবেনা, তখন আমার দলের হলেও আমাকে মূল্যায়ন করবেনা। কাজ অনুযায়ী মানুষ মূল্যায়ন করবে। ছাত্রলীগ সমর্থিত প্যানেলের হয়েই ডাকসুতে নির্বাচন করেছি। আল্লাহর রহমতে, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিপুল সংখ্যক ভোট পেয়ে বিজয়ীও হয়েছি। আমার প্রতি মানুষের যে আশা-আকাঙ্খা, যৌক্তিক দাবী, যৌক্তিক অধিকার, সৎ এবং ন্যায়ের পক্ষে থেকে সেগুলো আদায়ে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকবো।

ফেনীর সময় : সম্প্রতি ছাত্রলীগের দায়িত্ব পেয়েছেন, আপনি এ সংগঠনকে কী দিতে চান ?

সাদ : ছাত্রলীগের যেসব ইউনিটে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মাদক সহ যেসব অভিযোগ রয়েছে সেসব নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কথা বলেছি। এসব ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সাথে কথা হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ইউনিট কমিটি রয়েছে সেগুলো ঢেলে সাজাতে তারা বদ্ধপরিকর।

ফেনীর সময় : ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে বিদ্রোহ চলছে। যারা বিদ্রোহী তারাও ছাত্রলীগ। কেমন চাপ অনুভব করেন ?

সাদ : বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বৃহৎ সংগঠন। সারাদেশে লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী রয়েছে। ভালোবাসা থাকবে। মান-অভিমান, আবেগ থাকবে। চাওয়া-পাওয়া থাকবে। চাওয়ার সাথে পাওয়ার একটি দ্বন্ধও থাকবে। পদপ্রাপ্ত যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাদের নিয়ে নোটিশও দেয়া হয়েছে। আসলে এটা বিদ্রোহ নয়। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাদের বাদ দিতে আন্দোলন করছে। কথা বলার অধিকার সবার রয়েছে। সংগঠনের প্রতি সবাই দায়বদ্ধ। এটি কোন চাপ নয়।

ফেনীর সময় : অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ প্রত্যাশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে অভ্যন্তরীন রাজনীতির সংঘাতে শিক্ষার্থীদের মাঝে নেতিবাচক কোনও প্রভাব পড়বে কিনা?

সাদ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লালন উৎসব, লোকজ সংস্কৃতি সহ সব ধরনের আচার-অনুষ্ঠান চলমান রয়েছে। দু’একটা অনাকাঙ্খিত ঘটনাও ঘটেছে। সবচেয়ে বড় বিষয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবদ্ধ না। সকলের যাতায়াত রয়েছে। বিগত বছর পর্যবেক্ষন করলে দেখা যাবে, বড় কোন রাজনৈতিক সংঘাত হয়নি। মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রদল কিংবা অন্য সংগঠনগুলোর সহাবস্থান বিরাজ করছে। টিএসসিতে, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় আড্ডা দিচ্ছে। তুলনামূলকভাবে অনেক কমে আসছে। ২০০৯ পরবর্তী সময় থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি স্থিতিশীল।

ফেনীর সময় : ছাত্রত্ব নেই, কিংবা বিবাহিত। কিন্তু ছাত্রলীগের নেতা। এ ধারা বদলাবে ?

সাদ : ছাত্রলীগ একটি সুসংগঠিত সংগঠন। অভিযোগ যে কারো বিরুদ্ধে থাকতে পারে। কিন্তু এর সত্যতা থাকতে হবে। যারা অরজিনালি বিবাহিত, তথ্য-প্রমাণ সহ অভিযোগ আসবে। এ ব্যাপারে ছাত্রলীগ নোটিশ দিয়েছে। এদের বিষয়ে জিরো টলারেন্স। ছাত্রলীগের প্রথম শর্ত ছাত্র হতে হবে। যারা বিবাহিত তারা ছাত্রলীগ নয়।

ফেনীর সময় : জেলা কমিটিগুলো মেয়াদ শেষ, নতুন নেতৃত্ব তৈরির উদ্যোগ আছে কিনা ?

সাদ : অবশ্যই। যথাসময়ে সম্মেলন দেয়ার সময় হয়ে উঠে না। মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা বিবাহিত, গঠনতন্ত্র বিরোধী কার্যকলাপ চলছে। সেই জেলাগুলোতে সম্মেলন হবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেসব ইউনিটে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়নি অতিদ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

ফেনীর সময় : অভিযোগ আছে ছাত্রলীগ চরম বিশৃঙ্খল সংগঠন। এ নিয়ে আপনি কী বলবেন?

সাদ : একটা বাবার কাছে যখন ৫-৬ জন সন্তান থাকে তখন কিন্তু ঝগড়াঝাটি হয়। আবেগ-অনুভূতি থাকে বেশি। যার একটা বা দুটো সন্তান সেখানে মেলবন্ধন খুব বেশি হয়ে উঠেনা। আবার এটা যে চিরন্তন সত্য, তা নয়। বলতে চাচ্ছি- ছাত্রলীগ খুবই সুশৃঙ্খল একটি সংগঠন। এমন দ্বিতীয় সংগঠন আছে বলে মনে হয়না, এটা এ কারনে বললাম- কারো বিপদে আপদে ছাত্রলীগ এত দ্রুত পাশে দাঁড়ায়।

ফেনীর সময় : আপনাকে ধন্যবাদ।
সাদ : ‘ফেনীর সময়’কেও ধন্যবাদ।

antalya escort bursa escort adana escort mersin escort mugla escort samsun escort konya escort